নোটিশ:
  • আরো উন্নত ও সুপার ফাষ্ট ওয়েব ডেভেলপের কাজ চলছে।  আমাদের সাথে থাকার জন্য দেশ-বিদেশের সকল পাঠক ও সাংবাদিক'দের ধন্যবাদ।

মারজুক রাসেল: সংগ্রাম, ভালোবাসা আর সৃষ্টিশীলতার অজানা গল্প

মানিক সিকদার গোপালগঞ্জ বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
50.3kভিজিটর

বাংলাদেশের বিনোদন জগতের পরিচিত মুখ মারজুক রাসেল। কবি, গীতিকার, অভিনেতা ও নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে তিনি নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। কিন্তু এই অবস্থানে পৌঁছানোর পথটা মোটেও সহজ ছিল না। দারিদ্র্য, শ্রেণিবৈষম্য, একতরফা ভালোবাসার কষ্ট এবং জীবনের কঠিন সংগ্রাম পেরিয়েই গড়ে উঠেছে তাঁর শিল্পীসত্তা।

গোপালগঞ্জে জন্ম হলেও মারজুক রাসেলের শৈশব কেটেছে খুলনার দৌলতপুরে। তাঁর বাবা পাটকলে চাকরি করতেন এবং তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত কোয়ার্টারে পরিবার নিয়ে থাকতেন। শিক্ষা জীবনের শুরু সরকারি কৃষ্ণমোহন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে বাবার ইচ্ছায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে তাঁকে মাদ্রাসায় ভর্তি করা হয়।

ছোটবেলা থেকেই বই, কবিতা ও ছবির প্রতি তাঁর ছিল গভীর আকর্ষণ। পাঠ্যবইয়ে শিল্পী হাশেম খানের আঁকা ছবি তাঁকে মুগ্ধ করত। নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জসীমউদ্দীন, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, ফররুখ আহমেদ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা তাঁর কিশোর মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

শৈশবেই তিনি প্রত্যক্ষ করেন শ্রেণিবৈষম্য। ভালো ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও বাবার চাকরির শ্রেণিগত অবস্থানের কারণে অন্যদের তুলনায় নিজেকে বঞ্চিত মনে হতো তাঁর। এই অভিজ্ঞতা তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে।

মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর আরও এক ধরনের মানসিক সংকট তৈরি হয়। তাঁর পুরোনো বন্ধুরা যখন ওপরের শ্রেণিতে চলে যায়, তিনি যেন পিছিয়ে পড়তে থাকেন। এই হীনম্মন্যতা, কষ্ট ও আবেগ থেকেই অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় কবিতা লেখা শুরু করেন। ছন্দের আনুষ্ঠানিক জ্ঞান না থাকলেও তাঁর শিল্পী মন ছন্দকে অনুভব করতে পারত। খুলনার ‘জনবার্তা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কবিতা।

কৈশোরে এক মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন মারজুক। মেয়েটির বাবা ছিলেন পাটকলের প্রথম শ্রেণির কর্মচারী। ভালোবাসায় সাড়া না পাওয়ার কষ্ট তাঁকে দীর্ঘদিন তাড়িয়ে বেড়ায়। তাঁর নিজের ভাষায়, শৈশবের চাপ, হতাশা ও আবেগই পরবর্তীকালে তাঁর জীবন ও সৃষ্টিশীলতার ভিত্তি হয়ে ওঠে।

বাবার পুরোনো ‘নেভিকো’ রেডিওতে গান শুনতেন মারজুক। একদিন ঘোষকের মুখে শুনলেন—গানটি লিখেছেন অমুক। কৌতূহলী হয়ে বাবাকে প্রশ্ন করেছিলেন, গান কীভাবে লেখা হয়? বাবার উত্তর ছিল, এর জন্য অনেক পড়াশোনা করতে হয়। সেই মুহূর্ত থেকেই তাঁর মনে গান লেখার স্বপ্ন জন্ম নেয়।

১৯৮৯ সালে এক বন্ধুর সঙ্গে প্রথম ঢাকায় আসেন মারজুক। পরবর্তীতে পরিচয় হয় শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ, লুৎফর রহমান রিটন, শিহাব শাহরিয়ার ও ফারুক মামুনের মতো সাহিত্যাঙ্গনের মানুষের সঙ্গে।

১৯৯৩ সালে তিনি চূড়ান্তভাবে খুলনা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। আশ্রয়ের সন্ধানে একসময় কবি শামসুর রাহমানের বাড়িতে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়েন। কবিকে তিনি বলেন, ‘আমি অনাহারী’। নিজের বইয়ের শিরোনামের এই শব্দদুটি শুনে কবি তাঁকে ভেতরে নিয়ে যান এবং খাবারের ব্যবস্থা করেন। সেই ঘটনা তাঁর সংগ্রামী জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকে।

ঢাকায় এসে শুরু হয় কঠিন জীবনসংগ্রাম। কখনো সিনেমার টিকিট বিক্রি করেছেন, কখনো ফুটপাতে হকারি করেছেন, আবার কখনো বাসের টিকিটের জন্য যাত্রীদের কাছে অনুরোধ করেছেন। একসময় তোপখানা রোডের একটি গাড়ির গ্যারেজেও থাকতেন।

অভাবের চাপে লেখালেখি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল, হয়তো আর লেখা হবে না। কিন্তু শিল্পীসত্তা তাঁকে ছাড়েনি। এক ভোরে হঠাৎ একটি ভাবনা তাঁকে নাড়া দেয়। উঠে বসে লিখতে শুরু করেন। সেই লেখার নাম দেন ‘তিন অক্ষর’। তাঁর জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয় সেখান থেকেই।

পরে একটি কনস্ট্রাকশন প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। নিয়মিত যাতায়াত করতে থাকেন আজিজ মার্কেটে। পরিচিত হন তরুণ লেখকদের সঙ্গে। কবিতা ও গল্পের পাশাপাশি শুরু করেন গান লেখা।

জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে সাংবাদিক ফারুক মামুনের মাধ্যমে। সংবাদপত্রে কাজ শুরু করেন মারজুক। ফ্রিল্যান্স লেখালেখির সূত্রে পরিচয় হয় সঞ্জীব চৌধুরীর সঙ্গে। নিজের লেখা গান নিয়ে তাঁর কাছে গেলে সঞ্জীব চৌধুরী তাঁকে জেমসের সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ দেন।

এরপর হাতিরপুলের সাউন্ড গার্ডেন স্টুডিওতে জেমসের সঙ্গে দেখা করেন মারজুক। দীর্ঘ সময় তাঁর লেখা গান দেখার পর জেমস তাঁকে উৎসাহ দিয়ে বলেন—‘হবে, তোর হবে। তোর মধ্যে আগুন আছে।’

সেই সাক্ষাৎ তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে ওঠে। জেমসের সঙ্গে কাজ করতে করতে গানের জগতের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হন তিনি।

পরবর্তীতে তাঁর লেখা বেশ কিছু গান জনপ্রিয়তা পায়। ‘মীরা বাঈ’, ‘পত্র দিও’, ‘শরাবে শরাব’, ‘হা ডু ডু’, ‘আমি ভাসব যে জলে তোমায় ভাসাবো সেই জলে’, ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি, প্রেম আমার উপরে পড়েছে’, ‘ঈশান কোণের বায়ু’, ‘পাগলা ঘোড়া’সহ বিভিন্ন গান শ্রোতাদের মধ্যে পরিচিতি পায়। পান্থ কানাইয়ের কণ্ঠে ‘গোল্লা’ এবং আসিফের জন্য লেখা ‘তুমি হারিয়ে যাওয়ার সময় আমায় সঙ্গে নিও’ গানও আলোচিত হয়।

গানের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনচিত্রের জিঙ্গেল লেখাতেও কাজ করেছেন তিনি। ‘সুন্দরীতমা’, ‘সূর্য বলে আমার রোদে চুল শুকাতে আসো না’, ‘ভেজা হাওয়াই ভিজে যাওয়া’ এবং ‘সামনে পিছনে যারা তাদেরও স্বপ্ন আছে’—এ ধরনের বেশ কিছু বিজ্ঞাপনী গানের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িত।

শুধু লেখালেখি নয়, চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজও শিখতে চেয়েছিলেন মারজুক। বন্ধু মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর মাধ্যমে সহকারী হিসেবে কাজের সুযোগ পান। ‘কানামাছি’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও নাট্যকাজে যুক্ত হন। একই সঙ্গে অভিনয়েও পা রাখেন।

সাহিত্যাঙ্গনেও তাঁর রয়েছে নিজস্ব পরিচয়। প্রকাশিত কবিতার বইগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘শান্টিং ছাড়া সংযোগ নিষিদ্ধ’, ‘চাঁদের বুড়ির বয়স যখন ষোলো’, ‘বাঈজি বাড়ি রোড’ এবং ‘ছোট্ট কোথায় টেনিস বল’। এছাড়া ‘বাবা বাবা লাগে’ নামে নাটকও লিখেছেন তিনি।

মারজুক রাসেলের জীবন যেন একটি দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। যে ছেলেটি শৈশবে শ্রেণিবৈষম্যের কষ্ট দেখেছে, ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়েছে, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়েছে, কখনো ফুটপাতে আবার কখনো গ্যারেজে রাত কাটিয়েছে—সেই মানুষটিই পরবর্তীতে হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের পরিচিত কবি, গীতিকার ও অভিনেতা।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রতিভা কখনো সহজে হারিয়ে যায় না। সুযোগ পেলে প্রতিভা একদিন ঠিকই নিজের আলো ছড়ায়।

মারজুক রাসেল তাই শুধু একজন শিল্পীর নাম নয়; তাঁর জীবন সংগ্রাম, স্বপ্ন আর সৃষ্টিশীলতার এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প।

নিউজ শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর
Copyright©2025 WSB News24 All rights reserved
Desing & Developed BY ServerNeed.Com
themesbazarwsbnews25
x