নোটিশ:
  • আরো উন্নত ও সুপার ফাষ্ট ওয়েব ডেভেলপের কাজ চলছে।  আমাদের সাথে থাকার জন্য দেশ-বিদেশের সকল পাঠক ও সাংবাদিক'দের ধন্যবাদ।

মমতার ঋণ: ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে স্কুল আয়ার রাজকীয় বিদায়

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেটের সময় : বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৬
49.4kভিজিটর

একদিকে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় কাজের তাড়া, অন্যদিকে শত-শত চঞ্চল শিক্ষার্থীর হইচই। সবকিছুর মাঝে এক চিলতে শান্তির ছায়া হয়ে যিনি দাঁড়িয়ে থাকতেন, তিনি শেফালি বেগম। পদমর্যাদায় তিনি হয়তো একটি বিদ্যালয়ের ‘আয়া’ ছিলেন, কিন্তু দীর্ঘ ৩৪ বছরের একনিষ্ঠ সেবায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয় ‘শেফালি খালা’, অনেকের কাছে আবার পরম মমতাময়ী।

নওগাঁ সদর উপজেলার ফতেপুর (১ম) উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন শেষে অবশেষে আজ (৩০ সেপ্টেম্বর) অবসরে গেলেন। তাঁর এই বিদায়লগ্নে ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে নেমে এসেছিল এক অভূতপূর্ব আবেগঘন পরিবেশ, যা সচরাচর কোনো বড় কর্মকর্তার বিদায়বেলায়ও দেখা যায় না।

সংসারহীন জীবনে বিদ্যালয়ই ছিল শেফালির পরিবার। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি অবিবাহিত। নিজের কোনো ঘর-সংসার কিংবা সন্তান নেই। কিন্তু এই নিঃসঙ্গতা তাঁকে কখনো গ্রাস করতে পারেনি। কারণ, বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীকেই তিনি নিজের সন্তান মনে করতেন। পরম স্নেহে শিক্ষার্থীদের টিফিনের খোঁজ নেওয়া, মায়ায় জড়িয়ে তাদের ভুলত্রুটি শুধরে দেওয়া আর কেউ অসুস্থ হলে মায়ের মতো পরম যত্নে আগলে রাখার কারণে তিনি ছিলেন সবার নয়নের মণি। শিক্ষকদের ফরমায়েশ খাটতে গিয়ে নিজের ক্লান্তিকেও কখনো প্রশ্রয় দেননি তিনি।

শেফালি বেগমের অবসরের দিনে পুরো বিদ্যালয় জুড়ে এক শোকাতুর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবাই অশ্রসজল। যে মানুষটি এতগুলো বছর ধরে আড়ালে থেকে নিঃশব্দে বিদ্যালয়ের চাকা সচল রেখেছিলেন, তাঁর ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিদায় অনুষ্ঠানে তাঁকে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। শ্রদ্ধার স্মারক হিসেবে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় সংবর্ধনা উত্তরীয়, নগদ অর্থ ও বিভিন্ন উপহার সামগ্রী।

বিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় আরম্বর ভাবে তাঁর বিদায়ী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন নওগাঁ জেলা বিএনপির সাঙগঠনিক সম্পাদক ও ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি-নূর-ই আলম মিঠু।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাজ্জাদুল ইসলাম, বিদ্যালয় পরিচালানা কমিটির সদস্য লিটন হোসেন, অন্যান্য অতিথি, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বক্তব্য প্রদান করেন।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম মিঠু বলেন- শেফালি বেগম আমাদের বিদ্যালয়ের শুধু একজন কর্মচারী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম এক স্তম্ভ। দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে তিনি যেভাবে প্রতিটি শিক্ষককে সম্মান করেছেন এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে সন্তানের মতো ভালোবেসে আগলে রেখেছেন, তা আমাদের সবার জন্য এক অনন্য অনুপ্রেরণা। পদের দিক থেকে কেউ বড় বা ছোট হতে পারে, কিন্তু তাঁর কর্তব্যপরায়ণতা এবং মমত্ববোধ আমাদের সবার চেয়ে অনেক উঁচুতে। তাঁর এই নিঃস্বার্থ সেবার ঋণ ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয় কোনোদিন শোধ করতে পারবে না। আমরা তাঁর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করি। বিদায়ী শেফালি বেগম তাঁর বক্তেব্যে সকলের নিকট দোয়া কামনা করেন।

অনুষ্ঠানের সবচেয়ে মানবিক ও চোখ জুড়ানো দৃশ্যটি তৈরি হয় বিদায়ের ঠিক পর। সাধারণত সমাজের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা প্রধান শিক্ষকদের বিদায়বেলায় বিশেষ সম্মান জানানো হয়। তবে গুনী নারী শেফালীর ক্ষেত্রে ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয় সৃষ্টি করল এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁকে অত্যন্ত মর্যাদা ও ভালোবাসার সাথে একটি সুসজ্জিত ঘোড়ার গাড়িতে করে পৌছে দেয়া হয় বাড়িতে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শত শত শিক্ষার্থীর অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে, সেই রাজকীয় ঘোড়ার গাড়িতে চড়েই তিনি ফিরে যান নিজের বাড়িতে। যাওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের কান্না আর ভালোবাসায় আবেগ আপ্লুত হোন সবাই।

বিদ্যালয়ের এই অনন্য উদ্যোগটি সমাজকে এক বড় বার্তা দিয়ে গেল—কাজের ছোট-বড় দিয়ে মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় না। সততা, নিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করতে পারলে প্রাতিষ্ঠানিক পদের গণ্ডি পেরিয়ে এমন রাজকীয় সম্মান পাওয়া সম্ভব। ফতেপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে শেফালি বেগম চিরকাল মায়াবী এক মায়ের প্রতিচ্ছবি এবং এক সুমহান অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে থাকবেন।

নিউজ শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর
Copyright©2025 WSB News24 All rights reserved
Desing & Developed BY ServerNeed.Com
themesbazarwsbnews25
x