অনুরণন -ঋতু কর্মকার

ঋতু কর্মকার
  • আপডেটের সময় : শনিবার, ৮ মে, ২০২১
অনুরণন -ঋতু কর্মকার

এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেলো কিছুক্ষণ আগেই।তবুও কি মেঘের বিরাম আছে,সে সদর্পে এবং পূর্ণোদ্দমে গর্জন করেই চলেছে আকাশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেন মহাবিস্ফোরণ ঘটে চলেছে আজকে তাদের রাজ্যে।
ওই যে বাতাস শুরু হলো আবার, শন…শন…শন…আবার কি বৃষ্টি আসবে তবে???ওই এলো আবার…ঝুপঝাপ…

অবশ্য দার্জিলিংয়ে এসে বৃষ্টি না হলে বরং দার্জিলিংয়ের সৌন্দর্য উপভোগটাই অপূর্ণ থেকে যায়।বিকেলবেলা ম্যালের ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই দেখছিলাম আজকে ঘন কুয়াশার চাদরে কেমন মুড়ে গেছে চারদিক।তাছাড়া সবে কোভিডের আতঙ্ক শেষ হয়েছে।তাইজন্যই বোধহয় অবজারভেটরি হিলে লোকজনের আনাগোনা কম ছিলো।ভাবা যায়,একটা ক্ষুদ্র অণুজীবের কত ক্ষমতা, উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম পুরো পৃথিবীকে কুপোকাত করে লোককে ঘরবন্দী করে রেখে দিলো।তাও আবার একদিন নয়,দু’দিন নয়,দু’দুটো বছর!!!ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় পড়েছিলাম স্প্যানিশ ফ্লুর কথা যেটা কিনা ছিলো করোনার আগ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ধরনের মহামারী। কিন্তু এ যে দেখলাম তার চেয়েও ভয়ঙ্কর। তবে আঁধার কেটে আলো আসার মতন অবশেষে এ জুজুকেও বিদায় নিতে হলো,এই যা স্বস্তির কথা!যাহোক,ফিরে আসি নিজের কথায়। বছরখানেক হলো শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনায় ইস্তফা দিয়ে দার্জিলিংয়ে পাড়ি জমিয়েছি।কারণটা আর কিছুই নয়,পাহাড়ের নেশা আর দেশ-বিদেশের লোকজনের মিলনমেলার অংশ হবার ইচ্ছা। এরজন্য অবশ্য ছোটবেলায় বিটিভিতে দেখা পাহাড় নিয়ে তথ্যচিত্র, সেই বিখ্যাত কবিতার লাইন:”মেঘের গায়ে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ”,রবিবাবুর উপন্যাস, সত্যজিৎ রায়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা চলচ্চিত্র, ফেলুদা সিরিজ এগুলোই দায়ী।১৯৬২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত “কাঞ্চনজঙ্ঘা” সিনেমাটি ছিলো সিনেমা জগতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। সেইসময় রঙিন ফটোতে তোলা সিনেমাটিতে আবহাওয়ার সাথে সাথে, প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে মানুষের জীবনে সম্পর্কের যে ওঠাপড়া, অসাধারণ নৈপুণ্যতার সাথে তা ফুটে উঠেছে,সত্যি বলছি দার্জিলিং নিয়ে এত সিনেমা, নাটক,তথ্যচিত্র,ভিডিও দেখেছি কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘার অমন রূপ আমি অন্য কোথাও পাইনি। সত্যজিৎ বাবু সত্যিই অনুপ্রাণিত করেছেন।তাইতো বাস্তবে কাঞ্চনজঙ্ঘার সে রূপ-সুধা পান করতে নীড় বেঁধেছি এই পাহাড়ের রাণীর শহরে।আমার বাংলোটা অবজারভেটরি হিল থেকে খুব কাছে। আর জানালা খুললে কিংবা বারান্দায় বসলেই দেখা মেলে পর্বতরাজ হিমালয়ের তৃতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গের। সন্ধেবেলা চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে যখন দাঁড়ায় ছাদে গিয়ে, কত লোকজন,ছেলে-বুড়োর চলাচল দেখি।কেউ বা লাঠি হাতে ছোট্ট নাতিকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়েছে, কেউবা ঘোড়ার পিঠে করে আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ কেউ চা-কফি বা হটচকলেটে চুমুক দিতে দিতে নানারকম আলোচনা করছে,কেউ লেন্সে চোখ লাগিয়ে ক্যামেরায় ছবি তুলছে, কতজনের স্পষ্ট বা অর্ধ সমাপ্ত কথা কানে আসে। বেশ মজা পাই।আর ভাবি কোনো একদিন এভাবে হঠাৎ করে যদি দেখতাম থ্রি মাস্কেটিয়ার্স অর্থাৎ, ফেলুদা,তোপসে আর লালমোহন বাবু ওরফে জটায়ু চলেছেন আবার ম্যালের পথে, উফ্!ভাবতেও রোমাঞ্চ হয়।যারা ফেলুদা সিরিজের ভক্ত তারা তো নিশ্চয় জানেন,ফেলুদার গোয়েন্দাগিরির সূচনা কিন্তু এই দার্জিলিংয়েই।আহ্!সবুজ পাহাড়ের সারি,বাতাসিয়া লুপ,ধোঁয়া ছেড়ে চলা টয় ট্রেন,রোডডেনড্রনের গুচ্ছ, নেপালি-তিব্বতি সংস্কৃতির বিচরণক্ষেত্র,পুরোনো মন্দির,চার্চের ঘণ্টাধ্বনি সেইসাথে নিরিবিলি জঙ্গলে রহস্যের গন্ধ সবকিছু মিলে এককথায় দার্জিলিং একদম জমজমাট।

যাহোক,আলোটা চলে গেলো। এখানে লোডশেডিং অবশ্য হয়না খুব একটা। মোমবাতিটা জ্বালিয়ে দিলাম। মেঘলা আবহাওয়ায় মোমবাতির কোমল আলোতে আজ কেবল পুরনো স্মৃতিচারণ করতে ইচ্ছে হচ্ছে।ফোনে হালকা আওয়াজে চলছে রবীন্দ্র সংগীত।যখন শান্তিনিকেতনে ছিলাম তখন বর্ষার রূপ ছিলো অন্যরকম।আমরা নাচে,গানে, কাব্যে বরণ করতাম বর্ষাঋতুকে।আর বসন্তের সেই দোল উৎসব!অমনটি আর কোথাও পাওয়া যায়না!আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম “ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল ” গাওয়ার জন্য। আমার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বরাবরই একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিলো। আমরা সবাই মিলে অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে থেকেই লেগে পড়তাম তোড়জোড়ে।কে কি গান গাইবে,কোন কবিতাটা পড়া হবে,পোশাকটা কেমন হবে সবকিছু নিয়ে চলতো চূড়ান্ত ব্যস্ততা।রিহার্সালের সময়গুলোর কথা বারবার মনে পড়ে।রিহার্সালের সময় একসাথে মাটিতে বসে খাওয়াদাওয়া,পেয়ালা পেয়ালা চা সে এক অনন্য অনুভূতি।শান্তিনিকেতনে অবশ্য এ ব্যাপারটা ছিলো,বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মানেই খুব একটা নাকউঁচানো ভঙ্গি থাকতে হবে তেমনটা সচরাচর ঘটতো না। তবে টিভিতে দেখছিলাম করোনা আবহে সে বসন্ত উৎসবও বন্ধ ছিলো গতবছর থেকে।তবে আবার তা চালু হবে সামনে বছর থেকে নিশ্চয়।শান্তিনিকেতনের সৌন্দর্য আর দার্জিলিংয়ের সৌন্দর্য দুটোই আসলে নিজেদের মতো করে অনন্য।কোনোটার সাথে কোনোটার তুলনা হয়না।যদি তার তুলনা করতে চাওয়া যায়,তবে তা হবে ধৃষ্টতা।শান্তিনিকেতনে সকালটা শুরু হতো প্রার্থনা ভবনে বাচ্চা থেকে বুড়ো সকলের সমস্বরে গাওয়া প্রার্থনা সংগীতের ভেতর দিয়ে।আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে,সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দরসহ আরো কত গান। সবুজ ধানখেত, গহীন জঙ্গল,শাল-মহুয়ার পাগল করা ঘ্রাণ,ছৌনাচ,আদিবাসীদের গ্রামে রাতের বেলায় কাঠ জ্বালিয়ে হলদে-সবুজ শাড়ি পরে সারিবদ্ধভাবে নাচ,বাউল গানের টান এসব ছিলো আমার নিত্যদিনের অভ্যেস।”আগন্তুক”সিনেমার উৎপল দত্তের চরিত্রের মতন ওদের সারল্য আমাকে আকর্ষণ করতো নিয়ত।সাঁওতালি গ্রামের ধামসা -মাদলের আওয়াজ ছাড়া মনে হতো সপ্তাহান্তটা পূর্ণ হলোনা। আর শুনতাম ওদের নানারকম রূপকথার গল্প। কিভাবে পিলচু বুড়ো আর পিলচু বুড়ির সন্তানদের থেকে ওদের সাতটা গোষ্ঠী হলো,কিভাবে ওরা কত বীরত্বের সাথে সাম্রাজ্যেবাদী শক্তিকেও পরাস্ত করেছিলো এটাসেটা আরও কত কি।আদিবাসীদের হাতের কাজও দারুণ প্রশংসার দাবি রাখে। বাঁশ-কাঠের তৈরী নানারকম উপাদান,হস্তচালিত তাঁতের কিছু কাপড় আমি দার্জিলিংয়ে আসার সময়ও এনেছি সাথে করে।ছৌনাচের অভাবটা যেন একটু হলেও কম হয় সেজন্য দেয়ালে বিশাল একটা ছৌনাচের মুখোশ লাগিয়েছি আর বারান্দায় আছে নেপালী আর তিব্বতি মুখোশের কিছু সংগ্রহ।

বারান্দায় সাজিয়ে রেখেছি তাতে চিন্তার কিছু নেই অবশ্য। তার কারণ,এখানে চুরির ঘটনা তেমন হয়না বললেই চলে।

আলোটা আবার চলে এলো,পাশের বাড়ী থেকে জোরে জোরে ফোনের আওয়াজ আসছে,এতক্ষণের নীরবতাটা ভাঙলো,বারান্দায় চেয়ারে বসে বেশ তো ঠান্ডা হাওয়া খাচ্ছিলাম!দূরে পাইন গাছের সারিগুলো অন্ধকারেও মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।বোঝা যাচ্ছে, পাশের বাড়িতে কেউ কার্টুন দেখছে। আমিও দেখতাম, ছোটবেলায় মিনা কার্টুন ছিলো আমার সবচেয়ে প্রিয়।আমাদের প্রজন্মের সকলের শৈশবের সাথেই এটা আসলে জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে শুরুতেই যেই গানটা মাথায় আসে:”আমি বাবা-মায়ের স্বাদ ও আদরের মেয়ে।”অবশ্য আমার মা,বাবা দেশেই থেকে গেছেন,এখানে আসেননি।ভ্রমণে তারা খুব একটা স্বস্তি বোধ করেননা।ওদিকে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুরু হলো।।।ঝিরিঝিরি বাতাসের সাথে নাকে আসছে মাটির সোঁদা গন্ধ।আজকে হয়তো এ ঐকতান সারারাত চলবে।

আকাশ এরকম মেঘলা থাকলে কালকে আর প্রাতে গৌরীশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার দর্শন হবেনা।দার্জিলিংয়ে আসার পর থেকেই অবশ্য টাইগার হিলের দিকে সকালবেলা হাঁটতে বেরোয়।সকালে টাইগার হিল,বিকেলে অবজারভেটরি সংযোগটা মন্দ নয়। আর প্রাতঃভ্রমণ শেষে ফেরার সময় মাঝেমধ্যেই নেপালী দিজু,ভাওজুদের দোকান থেকে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা মোমো আর গরুর খাঁটি দুধের চা,পিওর দার্জিলিং টি…একদম মধু…মধু…!!!

এখানে বাংলাদেশ থেকে প্রচুর পর্যটক আসেন। চেনাজানা কেউ এলে কখনো সখনো দেখা হয়।তখন অবশ্য অঘোষিত গাইডের কাজটা করতে হলেও আমার সেটা ভালো লাগে। কাউকে নতুন কোন জায়গা দেখাতে, নতুন কিছু জানাতে গিয়ে আমিও তো রোজ নতুন করে আবিষ্কার করি পাহাড়ের রাণীকে।বেঙ্গল ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম,রক
গার্ডেন, দার্জিলিং ক্যাবল কার, পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুলজিকাল পার্কে রেড পান্ডা, স্নো লেপার্ড, তিব্বতীয় নেকড়েসহ বিভিন্নরকম প্রাণীর দর্শন…মজাই তো!!!

দার্জিলিংয়ে থাকার সুবাদে ডুয়ার্সের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার সুযোগ হলেও এখনো অনেক জায়গা বাকি আছে।আসলে প্রকৃতি দু’হাত ভরে এখানে এত সৌন্দর্য দান করেছেন যে সৃষ্টিকর্তার এ বিশালতার সামনে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।চাঁপমারি ওয়াইন্ডলাইফ,ফুন্টসোলিংয়ের গুম্ফা ও চোর্তেনসহ বেশকিছু স্থানে যাবার পরিকল্পনা করছি সামনের ছুটিতে।তবে যে বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তোলে তা হলো পাহাড় কেটে নির্মিতব্য বিভিন্নরকম বড় বড় প্রকল্প যার জের ধরে প্রকৃতির ওপর পড়তে শুরু করেছে একটা বিরূপ প্রভাব।যদিও এখানে আমরা আদিবাসীসহ স্থানীয় জনগোষ্ঠীদের নিয়ে কাজ করি যেন সৌরশক্তিকে ব্যবহার করে যথাসম্ভব আমরা আমাদের প্রয়োজন মেটায়,জৈবিক চাষাবাদের ওপর গুরুত্ব দিয়ে, ধরিত্রীমাতাকে দূষিত না করে আবর্জনার মাত্রাটাও শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা করি।আসলে “বসুদৈব কুটুম্বকম্” তথা সারা বিশ্বই আমার আত্মীয় তো তখনই হবে যখন একটা পিঁপড়েও আমাদের কাছে নিরাপদ থাকবে।কিন্তু প্রশান্তির কথা এই যে এখনো এখানে প্রকৃতিমাতার প্রতি লোকেদের একটা ভালোবাসা আছে,একটা আত্মিক টান আছে।

যাহোক,আজকে স্মৃতির অনুরণন তো অনেক হলো, কাল সকাল হলেই টয়ট্রেন ধরে ছুটতে হবে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে।কয়েকজন প্রশিক্ষক আসবেন,টেকসই উন্নয়ন,সৌর শক্তির ব্যবহার নিয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য।তাদেরকে অভ্যর্থনা জানাতে হবে।আজকে না হয় এতটুকুই থাক।বাকিটা নাহয় নতুন প্রভাতের সাথে শুরু হবে…

[লেখার তারিখ:০৭ মে,২০২১]

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরও খবর
কপিরাইট ©২০০০-২০২০, WsbNews24.com এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Desing & Developed BY ServerNeed.Com
themesbazarwsbnews25
x