আর্ন্তজাতিক ক্রেতা-ভোক্তা অধিকার আইন লঙ্ঘন করে বাস ও লঞ্চের প্রভাবশালী মালিক সমিতির নেতৃত্বে একচেটিয়া ভাড়া বৃদ্ধির পায়তাঁরা চলছে বলে অভিযোগ করে অনতিবিলম্বে এমন পায়তাঁরা বন্ধ করার দাবী জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
আজ ২০ এপ্রিল বিকালে ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটিতে “যাত্রীদের দরকষাকষি বাদ দিয়ে বাস ও লঞ্চ মালিক সমিতি কর্তৃক একচেটিয়া ভাড়া বৃদ্ধির পায়তাঁরার প্রতিবাদে ” আহুত এক জরুরী সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী এমন অভিযোগ তুলেন।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেলে আনুপাতিক হারে বাস, লঞ্চ ও অন্যান্য গণপরিবহনের ভাড়া বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্ত বাস ও লঞ্চ মালিক সমিতি সরকারের কিছু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে যাত্রী সাধারণের প্রতিনিধিত্ব বা দরকষাকষি বাদ দিয়ে একচেটিয়া ভাড়া নির্ধারণের পায়তারা চালাচ্ছে। জনস্বার্থের ভাড়া নির্ধারণ কেন লুকোচুরি করা হবে। কেন মিডিয়া থেকে গোপন করা হবে।
বাড়তি ভাড়া নিয়ে বাসে বাসে লঞ্চে লঞ্চে হাতাহাতি মারামারির শিকার হয় যাত্রীরা, লাঞ্চিত হয় যাত্রীরা, কিন্তু এই ভাড়া প্রদানের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষ যাত্রী সাধারণের প্রতিনিধিত্ব বাদ দিয়ে একচেটিয়া ভাড়া নির্ধারণের পায়তাঁরার প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরা দেশের যাত্রী সাধারণের পক্ষে নিম্মবর্ণিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জনদুভোর্গের বিষয় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তুলে ধরেন।
১. ৫২ আসনের বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও ৫২ আসনের কোন বাসের ভাড়া তালিকা তৈরী করা হয়না। আরামদায়কের কথা বলে ৪০ আসনের ভাড়ার তালিকায় ৫২ আসন, ৫৫ আসন, ৬০ আসনের বাসে ভাড়া আদায় করা হয়। যা যাত্রী সাধারণের সাথে প্রতারণার সামিল।
২. বাসের ভাড়া নির্ধারণের ব্যয় বিশ্লেষণে ২১ টি উপদান আনা হয় মালিকদের মর্জিমত। সরকারি বা বেসরকারি বা ক্ষতিগ্রস্থ পক্ষের অথবা তৃতীয় পক্ষের কেউ উল্লেখিত উপাদানসমূহ যাচাই-বাচাই করার সুযোগ রাখা হয় না। ফলে একচেটিয়া ভাড়া নির্ধারণের সুযোগ থাকে।
৩. ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলোকে অস্বাভাবিক মূল্য ও অস্বাভাবিক ব্যাংক সুদ দেখিয়ে মূল্য বৃদ্ধি করে ভাড়া নির্ধারণের টেবিলে হাজির করা হয়, ফলে যাত্রী ভাড়া বেড়ে যায়।
৪. পুরোনো লক্কড়-ঝক্কড় বাসগুলো যাত্রীবোঝায় চলন্ত অবস্থায় এখানে সেখানে বন্ধ হয়ে যাত্রী দুভোর্গ সৃষ্টি করে। অথচ এই বাসগুলো রুটিন মেন্টেনেন্স, টায়ার, টিউব ইত্যাদি পাটর্সের অস্বাভাবিক মূল্য ধরা হয়।
৫. চালক, সহকারি, ভাড়া আদায়কারী ৩ জন স্টাফের বেতন ভাড়ার উপর নির্ধারণ করে ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়। অথচ এই নগরীর কোন বাসে চালক, সহকারী বা ভাড়া আদায়কারীকে কোন প্রকার বেতন বোনাস দেওয়া হয়না। তারা চুক্তিতে বাস চালাই, যা ভাড়া বৃদ্ধির প্রতারণার অন্যতম ফাঁদ।
৬. ঢাকা-চট্টগ্রাম মহানগরীতে চলাচলকারী কোন বাসের কম্প্রিহেনসিভ ইনসুরেন্স নাই, অথচ কম্প্রিহেনসিভ ইনসুরেন্স, দুর্ঘটনা মাইনর রিস্ক, গ্যারেজ ভাড়া অস্বাভাবিক দেখিয়ে একচেটিয়া ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়।
৭. ভাড়া বৃদ্ধির পর মালিকদের মর্জিমত ভাড়ার তালিকা প্রস্তুত, মালিকদের সুবিধামত স্টপেজ নির্ধারণ, দুরুত্ব বা কিলোমিটার চুরি ইত্যাদি পদে পদে যাত্রী ঠকানোর ফাঁদ থাকলেও সরকার যাত্রী সাধারণের প্রতিনিধি অর্ন্তভুক্ত না করায় এইসব প্রতারণা দেখার কেউ নেই।
৮. দুরপাল্লার বাসে কিলোমিটার হিসেবে ভাড়া নির্ধারিত থাকলেও যাত্রী সাধারণ স্বল্প দুরুত্বে গেলেও শেষ গন্তব্যের ভাড়া আদায় করা হয়।
৯. সিএনজিচালিত বাস ও ডিজেলচালিত বাসের আলাদা আলাদা ভাড়ার হার নির্ধারণ করা থাকলেও উভয় বাসে বর্ধিত হারে ভাড়া আদায় করা হয়। মনিটরিং ব্যবস্থা মালিকদের নিয়ন্ত্রনে থাকায় যাত্রীরা এহেন প্রতারণার শিকার হলেও দেখার কেউ নেই।
১০. ভাড়া নির্ধারণকালে চালক, সহকারি, ভাড়া আদায়কারি প্রতিবছর ঈদে দুটি ঈদ বোনাস ভাড়ার উপর ধার্য্য করে ভাড়া বৃদ্ধি করা হলেও বেতন বোনাস প্রদানের রীতি চালু না থাকায় প্রতিবছর ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য তৈরী হচ্ছে। ঈদযাত্রায় মনিটরিং ব্যবস্থা মালিকদের নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় প্রতিবছর এই নৈরাজ্য চরমভাবে বাড়ছে।
১১. দেশের বিভিন্ন এলাকায় সকালে এক ভাড়া, বিকালে আরেক ভাড়া, সন্ধ্যা হলে আরেক ভাড়া, বৃষ্টির দিনে আলাদা ভাড়া, বৃহস্পতিবার বিকালে নতুন ভাড়া, ঈদের আগে পরে আরেক ভাড়া, এহেন নৈরাজ্য প্রতিদিন সারাদেশের মানুষ ভুক্তভোগী হলেও সরকারী ফোরামে যাত্রী সাধারণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না করায়, সড়ক পরিবহন আইন মালিক সমিতির নিয়ন্ত্রিত আইন হওয়ায় দেশের লাখো লাখো ভুক্তভোগীদের সমস্যা দিনদিন বাড়ছে। অথচ বাস ও লঞ্চ মালিকেরা সরকারকে ম্যানেজ করে একচেটিয়া ভাড়া এসব ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের কাঁধে চেঁপে দিচ্ছে, যা নিতান্তই জুলুম বলে দাবী করেন।
১২. প্রতিটি ৫০/৫২ ও ৬০ আসনের সিটি সার্ভিসের বাসের সামনে দরজাটি যাত্রীদুর্ভোগ ও সড়ক নিরাপত্তার প্রধান কারণ। এসব বাসের দরজা-জানালা ভাঙ্গা, কনকনে শীতে যাত্রী যবুতবু, ভাঙ্গা ছাদে বৃষ্টির পানিতে ভিজে যাত্রীরা একাকার, চলন্তবাসে যত্রতত্র যাত্রী উঠা-নামা, রাস্তার মাঝে জীবনের ঝুঁিক নিয়ে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ রুটে বাস সংকট, অপ্রয়োজনীয় রুটে বাসের জটলা, রুটপারমিটের শর্ত না মেনে যেখানে ইচ্ছে চালকের মর্জিমত অর্ধেক রুটে বাস ঘুরিয়ে দেওয়া, রুটের লাভজনক অংশে বাস চালানো এমন হাজারো যাত্রী হয়রানীর চিত্র সমাধান করবে কে? সরকারী প্রতিটি কমিটিতে মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশন মনিটরিং কমিটিতেও তারা, মন্ত্রীর আশেপাশে মালিক সমিতির নেতারা।
যাত্রী দুভোর্গ ও ভাড়া নৈরাজ্যের এসব সমস্যা দেখবে কে? মন্ত্রীরা সবসময় মালিক সমিতি বেষ্টিত থাকায় মালিকদের পক্ষে কথা বলেন ফলে সড়কের নৈরাজ্য আরো আশকারা পায়। আমরা ভাড়ার নির্ধারণের টেবিলেও কি এসব বলতে পারবা না?
অতি সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্য তিনদফা কমার প্রেক্ষিতে প্রতি ১ টাকায় ১ পয়সা হারে বাস ভাড়া কমানো হয়েছে। একই সূত্র ধরে এবার প্রতিটি লিটারে ১৫ টাকা মূল্য বৃদ্ধির কারণে বাস ভাড়া প্রতিকিলোমিটারে সর্বোচ্চ ১৫ পয়সা বাড়ানো যেতে পারে। তার অন্যতা হলে যাত্রী কল্যাণ সমিতি কঠিন ও কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে। এসব বিষয় সুরাহার জন্য তিনি মাননীয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এতে আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপির প্রান্তিক জনশক্তি উন্নয়ন বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রভাবশালী নেতা অপর্ণা রায় দাস, কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ, মাহমুদুল হাসান রাসেল, আলমগীর কবির বিটু, মনজুর হোসেন ইসা প্রমুখ।