


বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ধান, গম ও ভুট্টার উন্নততর বীজ উৎপাদন এবং উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ভারত থেকে আমদানি করা বি-৩৩৫৫ জাতের হাইব্রিড ভুট্টাবীজের গুণগত মান, মজুতের হিসাব, সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি এবং ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পটির পরিচালক মো. হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে নিম্নমানের বীজ আমদানি, অবিক্রীত বীজের ব্যবস্থাপনা, মজুতের পরিমাণে অসংগতি এবং সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একটি অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫-২৬ মৌসুমে ভারত থেকে ৩০০ মেট্রিক টন বি-৩৩৫৫ জাতের হাইব্রিড ভুট্টাবীজ আমদানির জন্য কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রথম চালানে ২০০ মেট্রিক টন বীজ দেশে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা কম থাকায় কৃষক ও ডিলারদের মধ্যে তা বিক্রিতে সমস্যা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন কৃষি সচিবের হস্তক্ষেপে বাকি ১০০ মেট্রিক টন আমদানি বন্ধ করা হয়।
২০০ টন বীজের মধ্যে বিক্রি মাত্র ২২ টন
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আমদানি করা ২০০ মেট্রিক টন বীজের মধ্যে মাত্র ২২ মেট্রিক টন বিক্রি করা সম্ভব হয়েছিল। অবশিষ্ট ১৭৮ মেট্রিক টন বীজ গুদামে থেকে যায়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত প্রকল্পের পিআইসি সভায় বিষয়টি আলোচনায় আসে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে অবিক্রীত বীজ পরবর্তী মৌসুমে সংরক্ষণ করে বিক্রির পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
এখানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমত, আমদানির সময় বীজের গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য কী ধরনের পরীক্ষা করা হয়েছিল? দ্বিতীয়ত, বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা নির্ধারিত মানের নিচে থাকলে তা গ্রহণ, সংরক্ষণ কিংবা পরবর্তী মৌসুমে বিক্রির সিদ্ধান্ত কোন পরীক্ষার ফলাফল ও অনুমোদনের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল?
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা ছিল ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ, যেখানে সংশ্লিষ্ট অভিযোগে ন্যূনতম ৮০ শতাংশের মান উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রকৃত মান নির্ধারণের জন্য বীজ পরীক্ষাগারের প্রতিবেদন, আমদানির সময়কার পরীক্ষার ফলাফল, জাত ও বীজের প্রযোজ্য মানদণ্ড এবং ব্যাচভিত্তিক নমুনা পরীক্ষার নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
গুদামে বীজের বর্তমান অবস্থা কী?
অভিযোগে বলা হয়েছে, অবিক্রীত বীজের উল্লেখযোগ্য অংশ ঠাকুরগাঁও গুদামে এবং কিছু বীজ চুয়াডাঙ্গা গুদামে রাখা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের পর বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে আসার অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে স্বাধীন পরীক্ষাগারের কোনো প্রতিবেদন অভিযোগপত্রে সংযুক্ত নেই।
বীজের বর্তমান অবস্থা নির্ধারণে তাই জরুরি ভিত্তিতে গুদামভিত্তিক মজুত যাচাই, ব্যাচ নম্বর ও জাত শনাক্তকরণ, সংরক্ষণের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার রেকর্ড পরীক্ষা এবং স্বীকৃত পরীক্ষাগারে অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন। বীজে পোকায় আক্রান্ত হওয়া, হাতে বাছাই করা কিংবা অন্য জাতের বীজের সঙ্গে মেশানোর যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিও নমুনা পরীক্ষা ও সংরক্ষণ রেকর্ডের মাধ্যমে যাচাই করা দরকার।
বিশেষ করে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, নিম্নমানের বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বি-৩৩৫৫ জাতের সঙ্গে দেশীয় হাইব্রিড ভুট্টাবীজ মেশানো হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক মনোয়ারুল ইসলামের মাধ্যমে এ কাজ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। প্রমাণিত হলে বিষয়টি শুধু বীজের গুণগত মানের প্রশ্ন নয়; বরং জাতের বিশুদ্ধতা, বীজের পরিচিতি এবং কৃষকের কাছে সরবরাহ করা পণ্যের মান সম্পর্কিত গুরুতর বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
১৭৮ টন থেকে ২৬৩ টন: হিসাবের অসংগতি কেন?
২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বোরো, ধান, গম ও ভুট্টাবীজ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের প্রাক্সভা-সংক্রান্ত কার্যপত্রের বরাত দিয়ে অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ মৌসুমে বিক্রির জন্য বি-৩৩৫৫ জাতের হাইব্রিড ভুট্টাবীজের মজুত দেখানো হয়েছে ২৬৩ মেট্রিক টন। অথচ আগের হিসাব অনুযায়ী অবিক্রীত বীজ থাকার কথা ছিল ১৭৮ মেট্রিক টন।
এ হিসাবে পার্থক্য দাঁড়ায় ৮৫ মেট্রিক টন। অভিযোগপত্রে এই অতিরিক্ত পরিমাণকে বিভিন্ন জাতের বীজ মেশানোর সম্ভাব্য ফল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু শুধু মজুতের পার্থক্য থেকেই বীজ মেশানোর ঘটনা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় না। নতুন করে বীজ কেনা, অন্য উৎস থেকে স্থানান্তর, হিসাব সংশোধন কিংবা অন্য কোনো মজুত সমন্বয় হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
এ জন্য ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ মৌসুমের উদ্বোধনী ও সমাপনী মজুত, ক্রয় ও আমদানি চালান, বিক্রয় রসিদ, গুদাম স্থানান্তর রেজিস্টার, বীজ বিতরণ তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট সভার কার্যবিবরণী মিলিয়ে দেখা জরুরি। ৮৫ টনের পার্থক্যের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া না গেলে তা সরকারি সম্পদের হিসাব ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর নিরীক্ষা-প্রশ্ন তৈরি করবে।
৪ কোটি ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকার ক্রয় উদ্যোগ
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, চলতি বছরে ভারত থেকে বি-৩৩৫৫ জাতের হাইব্রিড ভুট্টাবীজ আমদানির জন্য ৪ কোটি ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকার একটি দরপত্র আহ্বান করা হয়, যার টেন্ডার আইডি ১৩০৪৮০৪। এতে বঙ্গো অ্যাগ্রিটেক লিমিটেডকে কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, আগের মৌসুমে ২০০ টন বীজ আমদানির পর মাত্র ২২ টন বিক্রি হয়ে থাকলে এবং বাকি বীজের গুণগত মান নিয়ে গুরুতর অভিযোগ থাকলে নতুন করে বিপুল পরিমাণ বীজ কেনার যৌক্তিকতা কী ছিল?
এ প্রশ্নের উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট ক্রয় প্যাকেজের চাহিদাপত্র, অনুমোদিত বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা, দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ, সরবরাহকারীর যোগ্যতার নথি, বাজারদর বিশ্লেষণ এবং প্রকল্পের বিদ্যমান মজুত বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না—তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বা কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকার অভিযোগ থাকলে সেটিও প্রামাণ্য নথির ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত।
ক্রয় আদেশ, কোটেশন ও ই-জিপি বিধিমালা
এ ঘটনায় মো. মনোয়ার হোসেন খান, পরিচিতি নম্বর ০২০৩৫৭, উপপরিচালক—কর্তৃক সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকের কাছে ক্রয় আদেশ বা কোটেশন-সংক্রান্ত কাগজপত্র পাঠানোর অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রযোজ্য সরকারি ক্রয়বিধি ও ই-জিপি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এ ধরনের কোটেশন-ভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকলে তার বৈধতা পরীক্ষা করা জরুরি।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর), ২০২৫ গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়। এতে সরকারি ক্রয়ে ই-জিপি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। একই বিধিমালার ৯০ থেকে ৯৪ নম্বর বিধিতে কোটেশন পদ্ধতির আওতায় পণ্য ক্রয়ের শর্ত, ই-কোটেশন আহ্বান, মূল্যায়ন এবং কার্যাদেশ প্রদানের প্রক্রিয়া নির্ধারিত রয়েছে। অতএব, ২০২৫ সালের বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ক্রয় কার্যক্রম শুরু হয়ে থাকলে কেবল সাধারণ কাগুজে কোটেশন সংগ্রহ করে ক্রয় সম্পন্ন করা বিধিসম্মত ছিল কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে কোটেশন পদ্ধতি নিজেই অবৈধ নয়; ক্রয়ের মূল্যসীমা, পণ্যের ধরন, প্রযোজ্য বিধি, কার্যক্রম শুরুর তারিখ এবং কোনো বৈধ ব্যতিক্রম বা অনুমোদন ছিল কি না—এসব বিবেচনায় নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে উপপরিচালক মো. মনোয়ার হোসেন খানের পাঠানো ৮ই সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে, স্মারক নম্বর: ১৫৫, পত্রের মাধ্যমে ক্রয়ের উদ্দেশ্য প্রেরিত পত্রের অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত এবং ই-জিপি পোর্টালে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যদি প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী ই-জিপিতে ক্রয় সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক থাকা সত্ত্বেও কোনো বৈধ অনুমোদন ছাড়া অফলাইন কোটেশন বা কার্যাদেশ ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে তা বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রশ্ন তুলতে পারে।
এ জন্য প্রকল্প পরিচালক, সংশ্লিষ্ট উপপরিচালক, প্রকল্পের ক্রয় কমিটি এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পৃথকভাবে পরীক্ষা করা উচিত। কেবল কাগজপত্র পাঠানোর ঘটনা থেকেই অসৎ উদ্দেশ্য বা অপরাধ প্রমাণিত হয় না; তবে ক্রয় প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নথিভিত্তিক তদন্ত জরুরি।
সরকারি অর্থ ও কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় তদন্তের দাবি। বিএডিসি দেশের কৃষি উৎপাদন ও বীজ সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। নিম্নমানের বীজ কৃষকের হাতে পৌঁছালে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, আর্থিক ক্ষতি এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, গুদামে দীর্ঘদিন ধরে বীজ অব্যবহৃত থাকলে তার কার্যকর ব্যবহারযোগ্যতা ও আর্থিক মূল্যও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এ অবস্থায় কৃষি মন্ত্রণালয়, বিএডিসির নিরীক্ষা বিভাগ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। তদন্তে আমদানি, মান পরীক্ষা, মজুত, বিক্রয়, বীজ মিশ্রণের অভিযোগ, ৮৫ টনের হিসাবের পার্থক্য এবং ৪ কোটি ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকার ক্রয় উদ্যোগ—সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে গুদামে থাকা বীজের নমুনা সংগ্রহ করে স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পরীক্ষা, ব্যাচভিত্তিক মজুত গণনা, সংশ্লিষ্ট ক্রয় নথি ও ই-জিপি রেকর্ড যাচাই এবং প্রকল্পের আর্থিক ক্ষতি নিরূপণ করা জরুরি। পরীক্ষায় বীজ অনুপযুক্ত প্রমাণিত হলে কৃষকের কাছে তা সরবরাহ বন্ধ রাখা এবং বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।
প্রকল্প পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির, উপপরিচালক মো. মনোয়ার হোসেন খান এবং সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য ও ব্যাখ্যা নিয়ে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। নথিপত্র ও পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করে অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং কোনো অনিয়ম না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের অবস্থানও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা উচিত।সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, মানসম্মত বীজ সরবরাহ এবং কৃষকের স্বার্থ রক্ষায় এই অভিযোগগুলোর দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক নিষ্পত্তি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।